Thursday | 22 January 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Thursday | 22 January 2026 | Epaper
BREAKING: বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কার করল বিএনপি      শাহজালালের মাজার জিয়ারত করলেন তারেক রহমান      আজ থেকে পরীক্ষা শুরু, ১২ ফেব্রুয়ারি হবে ফাইনাল: প্রধান উপদেষ্টা      দালাল সাংবাদিকতা দেশের অর্জনকে বার বার ম্লান করেছে: ফারুক ওয়াসিফ      বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ লাঘব করবে ই-বেইলবন্ড: আইন উপদেষ্টা      বাংলাদেশ থেকে কূটনীতিক পরিবারের সদস্যদের ফিরিয়ে নিচ্ছে ভারত      আ'লীগ সরকার আমলে বিদ্যুৎখাতের দুর্নীতির চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা      

বিএটি ফ্যাক্টরি: ডিওএইচএসে বিষের ভাগাড়

Published : Sunday, 18 May, 2025 at 9:35 PM  Count : 433

বাংলাদেশে পরিবেশের মারাত্মক সমস্যাগুলোর অন্যতম বায়ুদূষণ। শহরে বায়ুদূষণের প্রধান দুটি উপাদান হল শিল্পকারখানা ও যানবাহন। বায়ুদূষণের উপাদানগুলো মূলত- ধূলিকণা, সালফার-ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোকার্বন, কার্বণ মনোঅক্সাইড, সিসা ও অ্যামোনিয়া। অপরিকল্পিতভাবে শিল্পকারখানা স্থাপনে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ ক্রমাগত বাড়ছে। ক্ষতিকর উপাদানগুলোর ব্যাপক হারে নিঃসরণ ঘটছে। 

নানা দূষণের নগরীতে পরিণত হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা। হারাচ্ছে এই নগরীর বাসযোগ্যতাও। বায়ু, শব্দ, পানির দোষে মাঝেমধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও শিরোনাম হচ্ছে বাংলাদেশের রাজধানী। এর কারণ, স্বাভাবিকের চেয়ে এসব দূষণের মাত্রা কয়েক গুণ ছাড়িয়ে যাওয়া। বিশেষ করে বায়ু ও শব্দের অস্বাভাবিক দূষণে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জিসহ নানা রোগ-বিমারিতে ভুগছে নগরবাসী। পড়ছে ক্যান্সারের মতো রোগের ঝুঁকিও। অনেকের ধারনারও বাইরে কেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে বাড়ছে এসব ব্যধি? 

অসুখ-বিসুখে ওপরওয়ালা বা প্রকৃতিকে দায়ী করার একটি প্রবণতা রয়েছে অনেকের মধ্যে। মনুষ্যসৃষ্টকারণটা কখনো কখনো উহ্যই থাকছে। সব ধরনের দূষণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার তাগিদ থাকলেও বাস্তবে সেটার কার্যকরিতা কম। মাঝেমধ্যে কিছু অভিযান চলে। পরে আবার ‘যাহা বায়ান্ন তাহাই তেপ্পান্ন’ হয়ে যায়। গড়পড়তা ধারনায় মনে করা হয় মুগদা, মান্ডা, বসিলা, যাত্রাবাড়ী ধরনের এলাকাতেই বায়ু, শব্দ ইত্যাদি পরিবেশ দূষণ বেশি। বাস্তব তেমন নয়। মহাখালী ডিওএইচএসের মতো ঢাকার একটি অভিজাত এলাকাও বায়ূ দূষণের শিকার ভাবা যায়? আর সেটা গাড়ি বা ইটভাটার ধোঁয়ায় নয়। সিগারেট ফ্যাক্টরির কারণে। এমন একটি আবাসিক এলাকায় কারখানাটি কিভাবে এতদিন চলছে, অবাক করার বিষয়।

আদতে মহাখালী ডিওএইচএস একটি মিশ্র আবাসিক এলাকা। সেখানে অনেকটা নীরবে চলছে ব্রিটিশ-আমেরিকান টোবাকো- বিএটি কারখানা। এ  থেকে নির্গত তামাকের রাসায়নিকের কারণে বাতাস দূষিত হচ্ছে অবাধে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে তামাক পাতা আনা-নেয়া হয় সেখানে। পরে উৎপাদিত তামাক পণ্য সারাদেশে পরিবহন হয় বড় বড় ট্রাক-লরিতে। যার সুবাদে এলাকাটিতে যানজট, শব্দদূষণ  বায়ুদূষণের ষোলোকলা। বিশ্বের অন্যান্য দেশ শহরের মাঝখান থেকে ক্ষতিকর তামাক কারখানাগুলো সরিয়ে যেখানে স্বাস্থ্যবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলছে। সেখানে বাংলাদেশের রাজধানীর এই অভিজাত এলাকাটির এ দশা উপলব্ধি করছেন কেবল ভুক্তভোগীরাই। অনেকের জানার বাইরে। ধারনারও বাইরে। 

ডিওএইচএসের ভুক্তভোগীরা মাঝেমধ্যে মানববন্ধন, সেমিনার, সংবাদ সম্মেলন ধরনের কিছু প্রতিবাদ করে। সম্প্রতিও করেছে। সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে অবিলম্বে মহাখালীর ডিওএইচএস এলাকা থেকে বিএটি’র তামাক কারখানা অপসারণের। বাংলাদেশের জন্মেরও ৫-৬ বছর আগে, ১৯৬৫ সালে যখন ঢাকার মহাখালী ডিওএইচএস এলাকায় ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর কারখানা বসানো হয়। তখন এটি ছিল একটি গ্রামীণ জনপদের মতো।  ক্রমান্বয়ে মহাখালী ডিওএইচএস এলাকা ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক ও পর্যায়ক্রমে মিশ্র-আবাসিক এলাকা হয়ে ওঠে। এখানে হাজার হাজার পরিবারের শিশু, বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সী কয়েক লাখ-লাখ মানুষের বসতি। অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার শিশু শিক্ষার্থি।  বিএটি কারখানা থেকে নির্গত তামাকের রাসায়নিকের কারণে বাতাস দূষিত তারা কী রকম সর্বনাশের শিকার হচ্ছে, তা ভাবনায় আসছে না প্রতিষ্ঠানটির। 

তামাক কারখানার মতো ক্ষতিকর একটি কারখানা কিভাবে ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকায় এখনো কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তা গুরুতর প্রশ্ন। বিশ্বের অন্যান্য দেশ শহরের মাঝখান থেকে ক্ষতিকর তামাক কারখানাগুলো সরিয়ে সেখানে স্বাস্থ্যবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলছে। তামাক কোম্পানির একচেটিয়া মালিকানাধীন ২০০ একর জমির একটি প্লট ব্যাংককে বেঞ্জাকিট্টি ফরেস্ট পার্ক করা হয়েছে, বর্তমানে যা একটি পাবলিক পার্কে রূপান্তরিত হয়েছে। ১৯২৭ সালে নির্মিত গ্রীসের এথেন্সের একটি তামাক কারখানা, সুলায়মানিয়া, কুর্দিস্তানের একটি তামাক কারখানা বর্তমানে সংস্কৃতিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত করা হয়েছে। মেলবোর্নের ৫.৩ হেক্টরের তামাক কারখানা ‘মরিস মুর’ বর্তমানে ১০০ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক পার্ক করা হয়েছে। বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষের মৃত্যু এবং ১৫ লক্ষাধিক মানুষ ফুসফুস ক্যান্সার, মুখের ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, অ্যাজমা ইত্যাদি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ তামাক। কোনো গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুদূষণে ইটভাটার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর তামাক ফ্যাক্টরি। 

কম-বেশি সবারই জানা, তামাক চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণও পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। মহাখালী ডিওএইচএস এলাকার শিশু-বৃদ্ধসহ সকলের সেই ক্ষতি নিশ্চিত করছে বিএটি’র তামাক কারখানাটি। এটির কারণে এলাকাটি নিকোটিনসহ ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানের ভাগাড় হতে বসেছে।  বিশ্বে বাতাসের দূষণ নিয়ে যেসব সংস্থা কাজ করে সেগুলোর মধ্যে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) অন্যতম। এই একিউআইয়ের হিসেবে প্রায়ই টানা পাঁচদিন বা সাতদিন ধরে শীর্ষে থাকে বাংলাদেশ। শীর্ষে না থাকলেও ঢাকায় বাতাসের যে কোয়ালিটি তা কোনোভাবেই স্বাস্থ্যকর নয় বলেও সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হচ্ছে। অথচ সেদিকে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কোনো মনোযোগ নেই। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শহরের নিঃশ্বাসেই যেন বিষ মিশে আছে। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষের মৃত্যু এবং ১২ লাখের বেশি মানুষ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ তামাক। তামাকজনিত রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যয় প্রতিবছর অর্থনৈতিক ক্ষতি ৩০ হাজার ৫শত ৭০ কোটি টাকা। মহামান্য হাইকোর্টের রায় অনুসারে বিড়ি- সিগারেট এবং অন্যান্য তামাক পণ্য উৎপাদন রোধে সরকারকে যুক্তিসঙ্গত সময়সীমা নির্ধারন করে অন্য কোন শিল্পে স্থানান্তর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর পণ্য উৎপাদনকারী তামাক কোম্পানিতে সরকারের যতসামান্য  অংশীদারিত্ব সার্বিক তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টাকে দারুনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। পরিবেশ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুসারে তামাক কোম্পানি একসময় লাল শ্রেনীভুক্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিলো। পরিবেশ এবং মানব স্বাস্থ্যের উপর তীব্র প্রভাব ফেলে বিধায় আবাসিক এলাকায় লাল শ্রেনিভুক্ত শিল্প কারখানা কোনভাবেই থাকতে পারবে না। বিষয়টি অনুধাবন করে ২০২৩ সালে সংশোধিত বিধিমালায় খুবই চতুরতার সাথে তামাক লাল থেকে কমলা শ্রেণীতে নিয়ে আসা হয়েছে। ক্ষতিকর পণ্য উৎপাদন করার পরেও নীতি নির্ধারকদের প্রভাবিত করে তামাক কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে আবাসিক এলাকায় ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। 

পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর সিগারেট কারখানা অবিলম্বে মহাখালীর ডিওএইচএস এলাকা থেকে অপসারণ করে শহরের বাইরে নিয়ে যাওয়া জরুরি। কিন্তু উদ্বেগের সাথে লক্ষ্যনীয়, তামাকজাত দ্রব্যের মতো স্বাস্থ্যহানিকর পণ্য উৎপাদনকারী কারখানা লাল তালিকার অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও মহাখালীর মতো জনবহুল ও আবাসিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কারখানা স্থাপন করে অবস্থান করছে। তামাক উৎপাদন ও ব্যবহার শুধু মানবস্বাস্থ্য নয়, প্রাণিকুলের স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতিকেও স্থায়ী ঝুঁকিতে ফেলছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবাদী এবং তামাক বিরোধী সংগঠনগুলো তামাক কোম্পানির অনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রতিরোধের আহবান জানালেও সাড়া পাচ্ছে না তেমন। তামাকের মতো ক্ষতিকর পণ্যকে পুনরায় লাল তালিকাভুক্ত করার তাগিদ তাদের। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকা মহাখালীর ডিওএইচএস থেকে বিএটি’র তামাক কারখানা সরিয়ে সেখানে জনসাধারণের ব্যবহার উপযোগী একটি পার্ক হতে পারে। 

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন 


LATEST NEWS
MOST READ
Also read
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: [email protected], news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close